অশোক মিত্র। ছবি: সংগৃহীতবাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু অশোক মিত্র চলে গেলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। এন্ট্রান্স থেকে এমএ বরাবর প্রথম শ্রেণিতে প্রথম। ইন্দিরা গান্ধীর সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা আবার বামফ্রন্ট সরকারের প্রথম অর্থমন্ত্রী। ‘কবিতা থেকে মিছিলে’সহ বহু প্রবন্ধগ্রন্থ ও অর্থনীতিবিষয়ক গ্রন্থপ্রণেতা।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় অসামান্য ভূমিকা রাখেন। তাজউদ্দীন আহমদকে অশোক মিত্রই প্রথম নিয়ে যান ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে। পরে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সম্মানিত করে ঢাকায় নিয়ে গিয়ে। অসাধারণ স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন অশোক মিত্র। শেষ জীবন পর্যন্ত মুখে মুখে বলেছেন ফোন নম্বর বা মোবাইল নম্বর।
শেষ ভালোভাবে কথা বলেছেন গত ১২ এপ্রিল। জানতে চেয়েছেন আমার কাছে পৃথিবীর খবর। জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের কথা। এবং অবশ্যই ভারতের।
অশোক মিত্রকে নিয়ে ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে আমার সম্পাদনায় বের হয় ‘ঈক্ষণিকা’র অশোক মিত্রসংখ্যা।
স্পষ্টভাষী মানুষ ছিলেন অশোক মিত্র। দেশে-বিদেশে অধ্যাপনা করেছেন। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংকের উপদেষ্টা ছিলেন। নীতির প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন।
এক কথায় ছেড়েছেন ইন্দিরা গান্ধীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টার পদ। ছেড়েছেন জ্যোতি বসু সরকারের অর্থমন্ত্রীর পদ। কেন্দ্র ও রাজ্য সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস ও রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতার দাবিকে অন্য মাত্রা দিয়েছিলেন সারা দেশে।
সত্যিই অসাধারণ লেখক। পশ্চিমবঙ্গের জীবন্ত কিংবদন্তি ছিলেন তিনি। যাঁর গদ্য ছিল রাশিয়ান ব্যালে শিল্পীর মতো; মুহূর্তে তৎসম শব্দের পর পাটাতনের মতো তদ্ভব শব্দ ব্যবহারে চমকে দিয়েছেন পাঠককে। দুঃখের হলেও তাঁর লেখা ছাপার মতো সংবাদপত্র পশ্চিমবঙ্গে কমে এসেছিল। দৃঢ় রাজনৈতিক মতামত ছিল তাঁর। ছিলেন আজীবন কমিউনিস্ট।
পার্টির মুখপত্রে ২০০২ থেকে তাঁর লেখা ছাপা বন্ধ হয়ে যায় বিজেপির নেতাদের সঙ্গে একজন পার্টি নেতার ঘনিষ্ঠতার সমালোচনা করায়।
১৯৯৮ সালে প্রাথমিকে ইংরেজি ফেরানোর বিরোধিতা করে পথে নেমেছিলেন। বিরোধিতা করেছেন ভ্যাট ও জিএসটি চালুর।
নিজেদের কথা বলার রাজনৈতিক চিন্তাধারা প্রকাশের জন্য ২০১২ সালে সিদ্ধান্ত নেন বাংলায় একটি পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশের। নাম হলো ‘আরেক রকম’। শঙ্খ ঘোষ থাকলেন সম্পাদকমণ্ডলীতে। নিজে প্রেসে গেছেন, প্রুফ দেখেছেন। একটি দিনও ফেল হয়নি ডেটলাইন। আজ বের হলো তাঁর সম্পাদনায় পত্রিকার শেষ সংখ্যা।
গত ১ এপ্রিল বৈঠক করেছেন আমাদের নিয়ে ‘আরেক রকম’ সম্পাদকমণ্ডলীর।
অসুস্থতার আগে সম্পাদকীয় লিখেছেন। অসাধারণ এক ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ। আমার পিতা।
গতকাল সন্ধ্যায় এসেছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। গোর্কি সদনের কাছে পার্ক নার্সিং হোমে দেখতে।
আশ্চর্য সমাপতন।
২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ১ মে চলে গিয়েছিলেন তাঁর সহধর্মিণী গৌরী মিত্রও।
ড. ইমানুল হক: অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক
